ইতিবাচক ছাত্র রাজনীতি কোন পথে?

 ছাত্র রাজনীতি ক্যাম্পাসে থাকবে কিনা এই সিদ্ধান্ত ছাত্ররাই নিবে।

এই ভূখণ্ডে ছাত্র রাজনীতির রয়েছে এক গৌরবময় ইতিহাস । পাকিস্তান আমলে ও বাংলাদেশ সৃষ্টির পরে নানা শোষণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেছে ছাত্র নেতারা। ছাত্র সংগঠনগুলো জড়িত ছিল ওতোপ্রোতভাবে। অর্থাৎ বলাই যায় যে ছাত্র রাজনীতি এই ভূখণ্ডের জন্য গুরুত্বপূর্ণই ছিলো।
সর্বশেষ ১৮'র কোটা সংস্কার আন্দোলন ও ২৪'র গণ অভ্যুত্থানও ছাত্রদের রাজনৈতিক সচেতনতারই ফল। ঢাকাসহ সারাদেশের নেতৃত্ব'র দিকে তাকালেই দেখা যাবে, তাদের বড় একটা সরাসরি ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলো।
তবে গত ১৫ বছরে ছাত্র রাজনীতির গৌরবময় ইতিহাসকে ম্লান করে দিয়েছে ছাত্রলীগ নামক সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যকলাপ। ছাত্র রাজনীতির নামে ক্যাম্পাসগুলোকে পরিণত করেছিলো টর্চার সেলে। যেই টর্চার সেল থেকে আমরা আবরার সহ অসংখ্য শিক্ষার্থীকে বের হতে দেখেছি। শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করে ক্যাম্পাসগুলোতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল ছাত্রলীগ। গেস্টরুম নামক অত্যাচারের মধ্য দিয়ে সাধারণ ছাত্রদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সূচনা ঘটেছে এদের হাত ধরে। হলের ছাত্রদের দিয়ে জোরপূর্বক রাজনৈতিক প্রোগ্রাম, নেতাদের প্রটোকল দেওয়া ছিল নিত্যদিনের বিষয়।
গত ১৫ বছরে ছাত্র রাজনীতির নামে বাংলাদেশে যে রাজনীতি ছিলো, সেটাকে কোনোভাবেই ছাত্র রাজনীতি বলা চলে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে ছাত্র রাজনীতির সংজ্ঞা হচ্ছে, ‘ছাত্রদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা তোলা, এজেন্ডা হিসেবে গ্রহণ করানো এবং সেই এজেন্ডার পক্ষে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে কর্তৃপক্ষকে চাপ দিতে পরিচালিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ছাত্র রাজনীতি বলা যায়।'
ছাত্রলীগ নামক সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যকলাপের ভিত্তিতে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে ছাত্রদের রাজনৈতিকভাবে অসচেতন করা বা ক্যাম্পাসকে বিরাজনীতিকরণ কাম্য হতে পারে না।
তবে এখন প্রশ্ন হলো যদি ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ না হয়, তাহলে কিভাবে চলবে সুস্থ্য ধারার রাজনীতি? এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্র সংগঠনগুলোর বিতর্ক চালু হতে পারে।
হলে হলে সিট বাণিজ্য বন্ধ হলে, ছাত্র সংগঠন গুলোর লেজুড়বৃত্তি বন্ধ হলে ছাত্র রাজনীতি তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে যদি স্বাধীনভাবে কাজ করবার সুযোগ দেওয়া হয়, শক্ত মেরুদন্ড গঠন করতে দেয়া হয়। তবে ছাত্র সংগঠনগুলো কোনোভাবেই ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট করতে পারবে না।
আরেকটা পদ্ধতি আরও বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে, সেটি হলো ছাত্র সংসদ নির্বাচন চালু করা। বিগত সময়গুলো পর্যালোচনা করলেই দেখা যাবে, ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলো নিজদের নেতিবাচক কার্যক্রমের জন্য বরাবরই সাধারণ ছাত্রদের পছন্দের বাইরে চলে যায়। এমতাবস্থায় ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলে সাধারণ ছাত্ররা নিজদের ভোটে তাদের যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন করতে পারবে। ফলে সারাদেশের ক্যাম্পাসগুলোতে আমরা বিকল্প নেতৃত্বের দেখা পাবো। ছাত্রদের নির্বাচিত সেই বিকল্প নেতৃত্ব সাধারণ ছাত্রদের তথা দেশের নানা সংকটময় পরিস্থিতে দারুন ভূমিকা পালন করবে। যা নিঃসন্দেহে ছাত্র রাজনীতির জন্য কল্যাণকর হবে।
যদি এই প্রতিযোগিতা চালু হয়, তাহলে প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনগুলো না চাইতেও ইতিবাচক ছাত্র রাজনীতির পথ বেছে নেবে। কারণ সকল ছাত্র সংগঠনগুলোই চাইবে সংসদ নির্বাচনে ভালো ফল করতে।
এছাড়াও নানা পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে কিভাবে সংস্কার পূর্বক ইতিবাচক ছাত্র রাজনীতি ক্যাম্পাসে চালু রাখা যায় সে বিষয়ে বিভিন্ন মতামত বের করে নিয়ে আসা।
আমাদের দেশের জন্য ছাত্র রাজনীতি বন্ধ মোটেই কোনো সুস্থ্য সিদ্ধান্ত হতে পারে না। আমাদের বিশাল জনগোষ্ঠীর বড় একটি এমনিই রাজনৈতিকভাবে অসচেতন। তার উপর যদি ক্যাম্পাসগুলোকে বিরাজনীতিকরণের মাধ্যমে ছাত্রদেরও রাজনৈতিকভাবে অসচেতন বা রাজনীতি চর্চার পথকে যদি রুদ্ধ করে দেয়া হয়, তাহলে তা দেশের জন্য সামগ্রিকভাবে কল্যাণকর হবে না বলেই বিশ্বাস করি।

মোঃ আলিফ
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।

Comments

Popular posts from this blog

ভুলে ভরা বানানের ব্যানার নিয়ে সামির অবস্থান কর্মসূচি

বর্ধিত হলো ছাত্র অধিকার পরিষদের 'কেন্দ্রীয়' কমিটি, থাকছেন যারা-